বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা

হায়! শিক্ষা ব্যবস্থা!

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে আজ আমি যা শেয়ার করব তা আমার নিজের সাথে ঘটা কিছু ঘটনা যা বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র। তো আমি একটা বিশেষ কারণে ভার্সিটির একটা বিশেষ পরীক্ষা দিতে পারিনি। এর জন্য অনেক দৌড়ঝাঁপ, দরখাস্ত করে পরীক্ষাটা দেওয়ার সুযোগ হয়েছে, কিন্তু এখনও জানি না যে ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারব নাকি একটা বছর লস হবে। সেটা যাই হোক—

আসল বিষয় হলো, আমি যখন অনেক বাধা-বিপত্তির পর পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাই, তখন শুধু আমি একা পরীক্ষা দিচ্ছি। হলে আমি একা, যেহেতু আমি একাই পরীক্ষার্থী। কোনো ইনভিজিলেটর (পরিদর্শক) নেই। এই দিকে আমাদের বিভাগের যে কম্পিউটার অপারেটর, সে আমাকে রুমে দিয়ে চলে গেছে। আমার সাথে মোবাইল। চাইলেই নকল করতে পারি। এটা হচ্ছে আমাদের ন্যাশনাল কলেজের নিরাপত্তা। সেটাও বড় নয়, তার চেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমাকে ঐ কম্পিউটার অপারেটর নিজেই বলতেছে মোবাইল দেখে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য।

দাঁড়ান, কেউ মনে করবেন না আমি নকল করেছি। আলহামদুলিল্লাহ, আমার হিসাববিজ্ঞান বিষয়টা অনেক পছন্দের। আমি এই বিভাগে ভর্তি হয়েছি নিজ ইচ্ছায়। তাই মন থেকে পড়ে পরীক্ষা দিয়েছি।

আবার বিষয়ে আসি। তো যখন পরীক্ষা দিচ্ছিলাম, ঘণ্টাখানেক পর আরও তিনটা মেয়ে এসে একইভাবে পরীক্ষা দিতে শুরু করল। দেখি যে তারা ৪ ঘণ্টার পরীক্ষা মোবাইল দেখে দেখে দেড় ঘণ্টার মধ্যে শেষ! বাহ! কী আমাদের বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা!

এখানেই কি শেষ? না! আরও আছে। প্রথমবার যখন ভার্সিটিতে পরীক্ষা দিই, সেখানেও সবাই দেখে দেখে নকল করছে। স্যার-ম্যাডাম, যেদিন যেই আসুক, তাদের একটা কথা— “না মেতে লিখ”। কিরে ভাই, এরা কেমনে মানুষ হবে? দেশকে না এরা সামনে এগিয়ে নেবে!? দেশের আগামী নাকি এরা। আর ভার্সিটির শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হারের কথা বাদই দিলাম। যারা পড়াশোনা করে নাই, তারাও বলে ভার্সিটি মানে অনেক আরাম, চাপ নেই!!!

আচ্ছ, জাতির ভবিষ্যতের কথা বলায় মনে হলো।

আমি যদিও অনলাইনে কাজ করি বা টুকটাক ব্যবসাও করেছি, কিন্তু আমার চিরদিনের একটা শখের কাজ হলো পড়ানো, শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু করা, সুশিক্ষা দেওয়া। তাই শখের বসে অনেক কোচিং সেন্টারে পড়িয়েছি, কিন্ডারগার্টেন স্কুলেও পড়িয়েছি। বর্তমানে একটা হাই স্কুলে খণ্ডকালীন শিক্ষক।

এই পড়াতে গিয়ে দেখলাম — আহা, আজকাল বাচ্চারা আর ভালো করে পড়ার জন্য পড়ে না! আসলে সুশিক্ষা কী, তারা জানে না—বা হয়তো জানার দরকারও মনে করে না। তারা কেনো পড়ে জানেন? শুধু পাশ করার জন্য! কোনো রকম একটা ক্লাস পার হইতে পারলেই হলো, যেন জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যই “পাশ” শব্দটার মাঝে বন্দী।
দেখেন, এখানে তাদের দোষ দেবেন কীভাবে? আমি বরং চিন্তা করি—ওদের এই অবস্থার জন্য দায়ী কে? আসলে দায়টা তো আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার। ধীরে ধীরে ওদের এমনভাবে শিখিয়ে দিয়েছে যে, ভালো রেজাল্টই সব! বইয়ে কী আছে, কেন আছে, কাকে নিয়ে লেখা—এসব জানার কোনো প্রয়োজন নাই! মুখস্থ কর, লিখে দে, আর পাশ কর—এই হলো শিক্ষার সংক্ষিপ্ত সূত্র।

আরেকটু খুলে বলি, বুঝবেন কেমন “অসাধারণ” অবস্থা। আমি ক্লাস থ্রী-এর তিনজন ছাত্রকে পড়াই। এখন ওদের ক্লাসের অবস্থা জানেন? ওরা গণিত পারে না, ইংরেজি গ্রামার জানে না। ওরা চিনে শুধু মুখস্ত করা—যেন শিক্ষা নয়, মুখস্তই ধর্ম। এমনকি গণিত পর্যন্ত মুখস্ত করে ফেলে! এখন বলুন তো, এত গণিত মুখস্ত করা যায় কীভাবে? আহা, কিন্তু আমাদের শিক্ষকরা তো “অতীব প্রতিভাবান”! তারা তো সাজেশন দিয়ে দিবেন, তাই গণিত মুখস্থ করাও সহজ কাজ!

আমি যখন হাইস্কুলে যোগ দিলাম, তখন পরীক্ষার বাকি মাত্র তিন মাস। ক্লাস সেভেন -এর ইংরেজি পড়াতে গেছি—‘Narration’ পড়াবো। কিন্তু জানেন ওরা টেন্স কাকে বলে তা-ই জানে না! Sentence কী, verb কাকে বলে, verb-এর কয়টা form—সবকিছুই অজানা। একই অবস্থা ক্লাস ৮-এর। হায়! ওরা কী করবে? একসময় প্রশ্ন ফাঁস ছিল অপরাধ। এখন আর প্রশ্ন ফাঁস হয় না, এখন তাকে বলা হয়—“সাজেশন”! বাহ, আমাদের শিক্ষিত শিক্ষকদের কী অসাধারণ উদ্ভাবন! প্রশ্ন ফাঁসের বদলে সাজেশনের নতুন পোশাকে এনে তারা যেন শিক্ষার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় খুলে ফেলেছেন। এখন তো অবস্থা এমন, হাতে প্রশ্ন আসলে প্রশ্ন আর সাজেশনের পার্থক্য নির্ণয় করতে আপনার নতুন করে গবেষণা করতে হবে!

কি চমৎকার! একদিকে শিক্ষার নামে মুখস্থ, অন্যদিকে শিক্ষকদের নামে সাজেশনের গৌরব—এইতো আমাদের আলোকিত শিক্ষা ব্যবস্থা!

এই ভালো রেজাল্টের প্রতিযোগিতায় মা-বাবাও পিছিয়ে নেই। আহা, শুধু অশিক্ষিত নয়, শিক্ষিত নামধারী সুশীল সমাজের মানুষরাও এই দৌড়ে পিছু ছাড়ে না! যে কোনো স্যার বা ম্যাডাম যদি সাজেশন দিয়ে দেন, তারা সেটা অত্যন্ত প্রশংসনীয় মনে করে। কিন্তু বুঝতে পারে না, “আমার বাচ্চাটা তো শুধু গণিত মুখস্ত করেছে, আসলে কি পারবে?”—এই প্রশ্নের জবাব নেই। তাই প্রয়োজন হলে বাচ্চার স্কুলের এমন স্যারকে প্রাইভেট টিচার হিসেবে রাখেন, যে আসলে নিজেই নামমাত্র নকল-টকল করে পাশ করেছেন।

এখন বোঝা যাচ্ছে, শিক্ষিত মা মানেই শিক্ষিত জাতি নয়। নতুন করে বলা দরকার—সুশিক্ষিত মা মানেই সুশিক্ষিত জাতি। সারা বছর বাচ্চা কী করেছে তার কোনো খবর নেই। মোবাইল, কম্পিউটার নিয়ে সারাদিন অনলাইনে আসক্ত, অনলাইনের ঘৃণ্য ও নিষিদ্ধ ওয়েবসাইটে ঘুরাঘুরি, আধুনিকতার নামে জগন্য প্রেম—এসবই ওর দৈনন্দিন। আর পরীক্ষার সময় আসে—বাচ্চাকে অবশ্যই বেস্ট রেজাল্ট করতে হবে, টপ হতে হবে!

প্রাইভেট টিচার আর স্কুল, সবাই মিলে যেন নিশ্চিত করে দেয়—বাচ্চা পাশ করবে। আর পাশ করানোর জন্য স্কুলকে জোর-যবরদস্তি করতেও তারা ছাড়ে না। শিক্ষার নামে এতটা নাটকীয়তা—এটাই আজকের শিক্ষিত সমাজের “চমৎকার” বাস্তবতা!

আমি ক্লাসে একটা বাচ্চাকে বললাম—সামনের ছিটে এসে বসো। সে সরাসরি বলে, “স্যার, পারতাম না।” আমার কিলাকিলা লাগে, শরীরে ব্যথা জাগে। কারণ ওর বাবা এলকার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি।

আরেকজন বাচ্চার বাবা কিদ্যালয়ের স্কুল কমিটির সদস্য। সে অনেকদিন পর বিদ্যালয়ে আসে। সে ঐদিনই শুধু ক্লাসে এসেছে, এবং মাঝে শুধু প্রথম অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। তারপর বাচ্চার মুখে যা শুনলাম, তা যেন একটি নির্লজ্যের মতো মন্তব্য—“স্যার, আমি নয় বিষয়ও ফেইল করছি। এরদায় মিষ্টি খাওয়াইছি।” ভাবুন তো, কী অবস্থা!

আমি তো খন্ডকালীন শিক্ষক—অফিসে বসে সিনিয়রদের সাথে এসব বিষয় আলোচনা করলে তাদের কথাই শুনি: “তুমি ক্লাসে গিয়ে সিলেবাস দেখে দেখে শুদু পড়িয়ে এসো, আর কিছু বলার বা করার দরকার নেই।” অর্থাৎ, শিক্ষকের কাজ শুধু সিলেবাস শেষ করা; শাসন, গঠন বা চরিত্রগঠন—এসব তাদের তালিকায় নেই। প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকেও কোনো দায়বদ্ধতা বোঝা যায় না। নেই পারিবারিক কোনো শিক্ষা ।স্কুলে কিছু বললেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জামেলা শুরু করবে — আন্দোলন করবে, অভিযোগ দেবে — এই ভয় থেকেই অনেকেই মুখ খোলা তো দূরের কথা, নাক চেপে বসে যায়।

পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীদের আচরণ দিন দিন আরও উদ্বেগজনক হচ্ছে। ওরা বিদ্যালয়ে মোবাইল নিয়ে আসে— ক্লাস চলাকালীন যখন ইচ্ছে ক্লাস থেকে চলে যাচ্ছে। মোটরসাইকেল নিয়ে স্কুলে এসে Show off করে, স্কুলের পরিবেশে নষ্ঠ করে — এমনকি স্কুলের টয়লেটে গিয়ে ধূমপান করে, নেশাজাতীয় কিছু ব্যবহার করতেও পিছুপা হয় না। এ অবস্থায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা তো দূরের কথা — নৈতিকতা ও শিক্ষার মাত্রা কমে যাচ্ছে প্রতিদিন।

শিক্ষক-শৃঙ্খলা-অভিভাবক—এই তিনটি স্তম্ভ যদি দুর্বল হয়, তাহলে শিক্ষা তখন কেবল নামমাত্র আর প্রক্রিয়াগত হয়ে যায়, মানব গঠনের দায়িত্ব হারিয়ে ফেলে। আমরা যদি সত্যিই সুশিক্ষার কথা বলি, তাহলে শুধু সিলেবাস শেষ নয়—শিক্ষকের দায়িত্ববোধ, প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্ব, এবং অভিভাবকের সচেতনতা—এই তিনটা আমরা ফিরিয়ে আনতে পারলেই শিক্ষার মান বদলাতে পারব।

এমন হাজারো ঘটনা আছে আমাদের দেশে। কিন্তু শিক্ষকরা লজ্জায় বা দায়িত্ববোধের কারণে এ সম্পর্কে মুখ খুলে বলতে পারেন না। তাই আজকের শিক্ষার বাস্তবতা, বিশেষ করে প্রভাবশালী বা পরিচিত পরিবারের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে শিক্ষার অগভীরতা এবং অদৃষ্টময় মেলবন্ধন—এটাই আমাদের চোখে দেখা দিনব্যাপী দৃশ্য।

সাজেশনের কথায় মনে পড়ল—আপনারা কি চিন্তা করছেন সাজেশন যেহেতু দেয়, তাইলে একদিকে ভালো, আমার বাচ্চাটা পাস তো করবে? না, না, না! এটা হবে না। আমি কেন টিচার হয়ে সবাইকে সাজেশন দেব? আমি শুধু তাকেই দেব যে আমার কাছে প্রাইভেট পড়বে। আচ্ছা, আরেকটা কথা— আমি তো তেমন ভালো টিচার না, আমার কাছে কেন পড়বে? আইডিয়া! আমি বিদ্যালয়ে আমার ক্লাসটা করাবো না। তাইলেই তো ব্যাপারটা চুকে গেল। আমার সাবজেক্টে পাস করার জন্য আমার কাছে সবাই প্রাইভেট পড়তে আসবে। বাহ! টিচার হলে কত ফায়দা!!!! মনে করতাম এগুলো শুধু প্রাইভেট স্কুল, কলেজের কাজ। না, না। এটা এখন সব জায়গায়।

বাচ্চারা ক্লাসে মন দিয়ে পড়ে না, কারণ তার প্রাইভেট টিচার তো আছে, যে তাকে সাজেশন গলাধঃকরণ করে কোনো রকমে পাস করিয়ে দিতে পারবে।

দেখবেন, বর্তমান ফল—দিন দিন বাচ্চারা উগ্র স্বভাবের। তারা বড়-ছোট, সম্মান-অসম্মান কিছু বোঝে না। তাদের যেটা চাই, সেটা পেতে হবে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যদি ভালো থাকত, তাহলে আজ কিশোর বা আন্ডার-১৮ বয়সের বাচ্চারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে মিশতে পারত না। ক্লাসে টিচারদের সাথে টিটকারি করা তাদের কাছে আধুনিক ফ্যাশন। কুল ডুড হতে হলে উগ্র খারাপ ব্যবহার আবশ্যকীয়। ছি! জঘন্য পরিবেশ আমাদের এই বাংলাদেশের। কেন? ও কি জন্মের পরই খারাপ হয়ে গেছে?

আপনারা যারা শিক্ষক, তারা মুখে স্বীকার না করলেও মনে মনে এটা স্বীকার করবেন।

শুনুন, আপনি আপনার বাচ্চাকে মানুষ বানান, সুশিক্ষায় শিক্ষিত করুন। আপনার বৃদ্ধ বয়সেই কাজে লাগবে, পরিবার-সমাজের কাজে লাগবে। এমন স্কুল-কলেজ-বিদ্যালয় পরিহার করুন, যা শুধু পাশের হার দিয়ে বাচ্চাদের মন-মানসিকতা, সৃজনশীলতা সবকিছু বিচার করে। এমন টিচার পরিহার করুন, যারা না বুঝিয়ে আপনার শিশুকে শুধু গলাধঃকরণ করায়। কারণ প্রাইমারি শিক্ষায় যারা ভালো, তারাই উপরের শিক্ষায় খুব ভালো করে। যদিও ব্যতিক্রম হয়, তবে তার সংখ্যা একদম নগণ্য। আপনার বাচ্চাকে স্যার বা ম্যাডাম পড়াচ্ছে, সেটা খেয়াল করুন—কী পড়াচ্ছে। ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে ভুল করবেন বাচ্চার খাতায়। খেয়াল করবেন, ঐটা বাচ্চাকে আবার বোঝাচ্ছে কি না। খেয়াল রাখবেন যে সম্পূর্ণ বিষয় ও বই বোঝাচ্ছে নাকি শুধু সাজেশন দিয়ে পড়াচ্ছে। আপনার বাচ্চা আপনার, কিন্তু তার ভবিষ্যৎ দেশের সম্পদ। কাজে লাগবে—আপনার, আমার, আমাদের সবার।

না হলে কিছুদিন পর পর শুনবেন দুর্নীতিতে আপনার বাচ্চা পিএইচডি (Ph.D) করছে। ভালো লাগবে?

আপনার ছেলে বা মেয়ে ডাক্তার। তার হাতে ভুল চিকিৎসায় অপমৃত্যু এক বাচ্চার, যার মায়ের বুক এখন আপনার বাচ্চার জন্য খালি শূন্য। কী শুনতে ভালো লাগবে?

তাই আজ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সুন্দর, সঠিক ও প্রভাবশালী করার জন্য আমাদের এগিয়ে আসতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *