“অন্বেষণ (অন্তিম পর্ব) বই রিভিউ: এক নগন্য পাঠকের অনুভূতি” এর শুভ সূচনা।
যেদিন থেকে ‘অন্বেষণ (অন্তিম পর্ব)’ বইটি পাঠ করেছি, সেদিন থেকেই এর ঘোরে আচ্ছন্ন আমি। এই নগন্য পাঠকের কপালে কাজের সূত্রে বইটি প্রকাশের আগেই পড়ার সৌভাগ্য জুটেছিল, এবং সেই সুযোগ আমাকে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছে। যদিও বইটি প্রকাশের আগেই এর সবিস্তার বর্ণনা দেওয়া একপ্রকার স্পয়লার হয়ে যাবে, যা লেখক বা প্রকাশকের জন্য কাম্য নয়; তবুও এই মুহূর্তে মনের কথাগুলো না বলে থাকা অসম্ভব। বইটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশের পর নিঃসন্দেহে আরও অনেক কথা হবে।
নিজেকে ‘নগণ্য’ সম্বোধন করার কারণ এই বইটি। আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সাধারণ পটভূমি থেকে, মাদ্রাসার চৌকাঠ আমি মাড়াইনি; তাই ইসলামিক জ্ঞান-জগতের বিশালতার দিকে তাকালে আমার এই দীনতা আরও প্রকট হয়। কিন্তু এই বইটিতে পরিবেশিত সামগ্রিক তথ্যের গভীরতা এবং বিস্তৃতি এতটাই বেশি যে, আমার মন থেকে বারবার মনে হয়েছে, “আমি আসলে কিছুই জানি না!” এই উপলব্ধিই একজন পাঠকের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
যদি কেউ আমাকে প্রশ্ন করেন, এই বইটি আসলে কাদের পড়া উচিত, আমি দ্বিধাহীন চিত্তে বলবো, “সকলের জন্য।” কেন? কারণ এটি এমন এক আলোকবর্তিকা যা সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন।
ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে যারা সচেতন তারা অন্বেষণ (অন্তিম পর্ব) বইটি পড়লে ইসলামকে আরও সুন্দর ও যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করার মূল্যবান জ্ঞান অর্জন করবেন। তাদের বিশ্বাস আরও শাণিত হবে।
যারা মুসলিম কিন্তু জীবনযাত্রায় পুরোপুরি প্রায়োগিক নন তারা ইসলাম ধর্মের মায়াবী বন্ধনে আবদ্ধ হবেন। এর পরিধি, সৌন্দর্য এবং গভীরতা বুঝতে পেরে জীবনকে নতুন করে সাজানোর অনুপ্রেরণা পাবেন।
সংশয়বাদী এবং সত্যের অনুসন্ধিৎসুরা- যারা সত্য খুঁজছেন কিন্তু পাচ্ছেন না, বিভিন্ন ধর্মের গোলকধাঁধায় দিশেহারা, তাদের জন্য এই বইটি এক শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক। এটি তাদের সঠিক পথ নির্দেশ করবে।
নাস্তিক বা সংশয়বাদীরা যারা, তারা তাদের বহু অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন প্রশ্নের সুনিশ্চিত উত্তর এই গ্রন্থে খুঁজে পাবেন। এটি তাদের চিন্তার জগতে এক নতুন দিক উন্মোচন করবে।
অন্য ধর্মালম্বী যারা, তারাও বুঝতে পারবেন যে তারা আসলে নিজ ধর্ম সম্পর্কেই হয়তো পুরোপুরি জানেন না বা জানার মধ্যে ভুল থেকে গেছে। এই বইটি তাদের নিজস্ব বিশ্বাসের ভিত নিয়েও নতুন করে ভাবতে শেখাবে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই বই কাদের জন্য তা বর্ণনা করতে গেলে আমি ক্লান্ত হয়ে যাবো। এর পাঠক সমাজের কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডি নেই।
আমি কেন এই বইটিকে ‘শ্রেষ্ঠ’ আখ্যা দিচ্ছি, তার পেছনে বেশ কয়েকটি অকাট্য কারণ রয়েছে। প্রথমেই আসে লেখক এবং তাঁর অসাধারণ লেখনী। লেখক মুহাম্মাদ আল ইবরাহিম ভাই তাঁর লেখায় যে পরিমাণ গুরুত্ব এবং পরিশ্রম বিনিয়োগ করেছেন, তা একজন সচেতন পাঠক মাত্রই অনুভব করতে বাধ্য। আর যারা ইতোমধ্যে তাঁর ‘অন্বেষণ ১ম খণ্ড’ পাঠ করেছেন, তারা তো জানেনই এর মান কেমন। লেখকের বিশাল শব্দভাণ্ডারের জ্ঞান যে নিপুণভাবে কাজে লাগানো হয়েছে, তা বইটিকে একইসঙ্গে তথ্যবহুল ও সর্বসাধারণের জন্য সহজবোধ্য করে তুলেছে।
দ্বিতীয় এবং প্রধান কারণটি হলো বইটির তাথ্যিক দিক। যদিও একে ‘দ্বিতীয়’ বলা ভুল, এটি আসলে এর মূল স্তম্ভ। এই গ্রন্থের তথ্যসমৃদ্ধতা এর যোগ্যতাকে আকাশচুম্বী করেছে। যেভাবে বিভিন্ন সম্পাদকের মাধ্যমে তথ্যসমূহের মান যাচাই-বাছাই ও নিরীক্ষণ করা হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। বইটিতে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রয়োজনীয় এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে। এই গ্রন্থটি এমন এক বিরল সৃষ্টি যা একইসঙ্গে ইসলামিক, উপন্যাসিক ও নাটকীয় গুণাবলী সমৃদ্ধ। এর পাঠ শেষে আপনার মনে হবে, ‘ইস! এখনই শেষ হয়ে গেল!’ আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, এটি নিয়ে যদি কোনো বিশদ ইসলামিক নাটক নির্মাণ করা হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে সেরা সৃষ্টি হিসেবে গণ্য হবে। এছাড়া আরও অনেক কারণ রয়েছে যা পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আবিষ্কার করতে এবং স্বীকার করতে বাধ্য হবেন।
আমি দুঃখিত যে আমি এর ১ম খণ্ড পড়িনি। কিন্তু এই অন্বেষণ (অন্তিম পর্ব) পাঠ করার পর আমি এর বিষয়বস্তু, সারমর্ম ও জ্ঞান-নির্যাস সম্পূর্ণরূপে আত্মস্থ করে নিয়েছি। এর ফলস্বরূপ, আমার মনে এখন এর অন্বেষণ (অন্তিম পর্ব) খণ্ডটি পড়ার এক প্রবল আগ্রহ জাগ্রত হয়েছে। যারা নিয়মিত বই পড়েন এবং পাঠের গভীরে প্রবেশ করতে পারেন, তারা জানেন এই ‘আগ্রহ-ইচ্ছা’ আসলে কতটা গভীর অনুভূতির জন্ম দেয়। এটি শুধুমাত্র একটি বই পড়ার ইচ্ছা নয়, বরং জ্ঞানের আরও গভীরে প্রবেশের এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
আমি আবারও বলছি, আমি এক নগণ্য ব্যক্তি। তাই আমার এই অনুভূতি একান্তই আমার নিজস্ব, এবং আমি আশা করব এটিকে সেভাবেই বিবেচনা করা হবে। আমার এই কথায় যদি কোনো স্পয়লার এসে থাকে, তবে তার জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। তবে, যদি আমার মনের সম্পূর্ণ কথা প্রকাশ করতে যেতাম, তবে বইটি এখানেই প্রায় আবার লেখা হয়ে যেত, যা প্রকাশক ও লেখক উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। তাই এই অব্যক্ত কষ্টের কিছুটা অংশ মনের কোণে রয়ে গেল।
এই বইটি পাঠের অভিজ্ঞতা আমার ভেতরের জ্ঞানপিপাসাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ‘অন্বেষণ’ যেন প্রতিটি পাঠকের জীবনে নতুন আলোর দিশা নিয়ে আসে, সেই প্রত্যাশা রইল।

সত্য অনুসন্ধানী মানুষের জন্য ‘অন্বেষণ’ বইটি জানার ব্যাপ্তি আরও প্রশস্ত করবে আশাবাদী।