বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত Abidur Chowdhury : ক্রেডিটবাজীর আয়না আর আমাদের বাস্তবতা

অবদান শুন্য, ক্রেডিটবাজী শতভাগ! এই ফর্মুলাটাই যেন আমাদের জাতীয় ব্র্যান্ডিং হয়ে গেছে। যখনই বিশ্বমঞ্চে কোথাও “বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত” শব্দটা জুড়ে যায়, আমরা খুশির আতশবাজি ফাটাতে শুরু করি।

সাম্প্রতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত Abidur Chowdhury। Apple-এর বড়সড় প্রোগ্রামে তার নাম ভেসে উঠতেই দেশজুড়ে হৈচৈ পড়ে গেলো। অনেকে ফেসবুকে ঢাক বাজাতে লাগলেন—”দেখো, আমাদের ছেলে!” কিন্তু গুগল মামা একটু চোখ রাঙিয়েই জানিয়ে দিলেন, ভদ্রলোক আসলে লন্ডনে বড় হয়েছেন, সেখানেই বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা আর ক্যারিয়ার।

প্রশ্নটা হলো, সমস্যা কোথায়?

সমস্যা এই না যে তিনি বাংলাদেশী নন। তিনি আমাদের বংশোদ্ভূত—এটুকুই আমাদের কাছে গর্বের।
কিন্তু সমস্যা হলো—আমরা কেন প্রতি বার বংশোদ্ভূত খুঁজে বের করে ক্রেডিট নিতে হয়?
কেন আমাদের দেশে এমন পরিবেশ নেই, যেখানে জন্ম নিয়ে বড় হয়ে কেউ “Apple” বা “Google”-এর মতো প্ল্যাটফর্মে সাফল্যের গল্প লিখতে পারে? আমরা কেন বারবার অন্যের সাফল্যের সাথে নিজেদের নাম জোড়া লাগিয়ে গর্ব করি, অথচ নিজের দেশে সেই সাফল্যের মাটি চাষ করতে পারি না?

যদি বাংলাদেশেই বড় হতেন Abidur Chowdhury?

ভাবুন তো, যদি বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত Abidur Chowdhury ঢাকা শহরের কোনো স্কুলে পড়তেন? অফিস যাওয়ার জ্যামে আটকে থাকা বাবার হাত ধরে প্রতিদিন ক্লাসে যেতেন? প্রাইভেট টিউটর থেকে কোচিং সেন্টার, আবার স্কুল থেকে বাড়ি—এই রুটিনে কি কখনো তিনি নিজের মেধাকে সঠিকভাবে বিকশিত করতে পারতেন?

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা মুখস্থবিদ্যার কারখানা। আমাদের সমাজে উদ্ভাবনকে বলা হয় “ভাগ্যগুণে পাওয়া”। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার চেয়ে রাজনৈতিক ব্যানার টাঙাতেই বেশি সময় দেয়।

এই পরিবেশে একজন Abidur Chowdhury কি কখনো স্বপ্ন দেখতে পারতেন? নাকি হতো সেই চেনা গল্প”- ভাই, আগে চাকরি নাও। পরে যা হবার হবে!”

কেন আমরা পিছিয়ে?

বাংলাদেশে প্রতিভার অভাব নেই, সুযোগের অভাব আছে।

  • ইনফ্রাস্ট্রাকচার দুর্বল: আধুনিক ল্যাব, গবেষণাগার, বিশ্বমানের টেক পরিবেশ- সবই সীমিত।
  • শিক্ষার গণ্ডি: এখনো আমরা মুখস্থভিত্তিক শিক্ষাকে সফলতার মূল মনে করি।
  • সামাজিক মানসিকতা: পরিবার চায় নিরাপদ চাকরি, ঝুঁকিপূর্ণ স্বপ্ন নয়।
  • সিস্টেমিক ব্যর্থতা: মেধাবীরা সুযোগ না পেয়ে বিদেশে পাড়ি জমান, আর আমরা সেই সাফল্যকেই পরে “বংশোদ্ভূত” ট্যাগ দিয়ে নিজেদের কৃতিত্ব ভাবি।

ফলাফল? আমরা গর্ব করি বিদেশে জন্মানো বা বেড়ে ওঠা কাউকে নিয়ে, অথচ নিজেদের দেশের ভেতর থেকে তৈরি করা উদ্ভাবকদের পেছনে প্রয়োজনীয় শক্তি ঢালি না।

মিডিয়ার মাতামাতি

যখনই কোনো বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে যায়, আমাদের নিউজ মিডিয়া শিরোনাম বানায়— “বাংলাদেশের সন্তান জয় করলো বিশ্বমঞ্চ”

কিন্তু বাস্তবে উনারা বাংলাদেশের মাটিতে বড় হননি, বাংলাদেশের শিক্ষা বা গবেষণা সিস্টেম থেকে উঠে আসেননি। আমরা কেবল একটি “ট্যাগলাইন” ধরে গর্ব করি।

এ যেন এক ধরনের ক্রেডিটবাজী প্রহসন। যেখানে আসল অবদান শূন্য, তবুও নিজেদের জয়গান গাওয়া হয় শতভাগ।

স্বপ্নের বাংলাদেশ কেমন হতে পারে?

একটা দিন কল্পনা করুন- যেদিন আর “বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত” ট্যাগ লাগিয়ে গর্ব করতে হবে না।
বরং বলবো, “এই ব্যক্তি বাংলাদেশের মাটিতেই বড় হয়েছেন, এখানেই স্বপ্ন দেখেছেন, এখানেই সুযোগ পেয়েছেন, আর আজ বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিয়েছেন।”

আমরা চাই এমন একটা বাংলাদেশ-

  • যেখানে শিক্ষা শুধু মুখস্থবিদ্যা নয়, বাস্তব উদ্ভাবনের মঞ্চ হবে।
  • যেখানে গবেষণা হবে বৈজ্ঞানিক চর্চার মূল চালিকা শক্তি।
  • যেখানে সমাজ বলবে—”চাকরি নয়, স্বপ্ন বেছে নাও।”
  • যেখানে প্রতিটি শিশু বড় হবে বৈশ্বিক স্বপ্ন নিয়ে, দেশের ভেতর থেকেই।

বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত Abidur Chowdhury আমাদের সামনে এক আয়না ধরে দিয়েছেন। আয়নায় আমরা দেখি—আমাদের দেশে স্বপ্নের অভাব নেই, সুযোগের অভাব আছে। আমরা দেখি- আমরা অবদান রাখতে পারিনি, তাই ক্রেডিটবাজী করছি।

কিন্তু একদিন আসবে, যেদিন আমরা কেবল গর্ব করবো না, অবদান রাখবো। সেদিন “বংশোদ্ভূত” শব্দটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে।

কারণ তখন আমরা বলতে পারবো, “এটা আমাদেরই সন্তান, আমাদেরই বাংলাদেশ তৈরি করেছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *