লেখক: NRG Alfa Zone |
প্রকাশ: |
বিভাগ: বিবাহ (ওয়াকিল)
সূচিপত্র
ইসলামি আইনশাস্ত্র (ফিকহ) অনুযায়ী, বিবাহ কেবল একটি জাগতিক বন্ধন নয়, বরং এটি একটি পবিত্র ‘মিছাক’ বা দৃঢ় অঙ্গীকার। এই চুক্তির আইনি বৈধতা নিশ্চিত করার জন্য ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (গ্রহণ) এবং ন্যূনতম দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর উপস্থিতি অপরিহার্য। সমকালীন বাঙালি মুসলিম সমাজে ‘উকিল বাপ’ নামক যে সামাজিক প্রথাটি প্রচলিত, ইসলামি শরীয়াহর মানদণ্ডে এর আইনি ভিত্তি এবং প্রয়োগিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে গভীর আলোচনার অবকাশ রয়েছে।
১. ওকালত বা প্রতিনিধিত্বের আইনি অগ্রাধিকার ও বিন্যাস
ইসলামি আইনতত্ত্বে বিবাহের অভিভাবকত্ব বা ‘বিলায়াত’ একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিবাহের চুক্তিতে কনের পক্ষ থেকে সম্মতি জ্ঞাপন বা প্রস্তাব উপস্থাপনের ক্ষেত্রে শরীয়াহ নির্দেশিত অগ্রাধিকারের ক্রমধারা নিম্নরূপ:
- নিকটতম অভিভাবক: বিবাহের ক্ষেত্রে কনের পিতা হচ্ছেন প্রধান এবং স্বাভাবিক অভিভাবক। এখানে ওলি (Wali) এবং ওয়াকিল (Wakil)-এর সংজ্ঞাগত পার্থক্য স্পষ্ট করা প্রয়োজন। শরীয়তের পরিভাষায় ‘ওয়ালি’ হলেন কনের মূল অভিভাবক যার স্বাভাবিক ও আইনগত কর্তৃত্ব রয়েছে, আর ‘ওয়াকিল’ হলেন তিনি যাকে নির্দিষ্ট কোনো কাজের জন্য (যেমন ইজাব-কবুল সম্পন্ন করা) প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়। পিতা নিজে উপস্থিত থাকলে তিনি ‘ওয়ালি’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তবে তিনি চাইলে অন্য কাউকে ‘ওয়াকিল’ নিযুক্ত করতে পারেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা পিতাকে পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “অভিভাবকের সম্মতি ও দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর উপস্থিতি ব্যতিরেকে বিবাহ সংঘটিত হয় না” (সুনানে আবু দাউদ)। সুতরাং, পিতার উপস্থিতিতে অন্য কোনো অনাত্মীয়কে ‘উকিল’ হিসেবে স্থলাভিষিক্ত করা কেবল সুন্নাহর পরিপন্থীই নয়, বরং এটি পিতার আইনি অধিকারকেও সংকুচিত করে।
- মাহরাম বা রক্ত সম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়: পিতার অবর্তমানে বা অসমর্থতায় দাদা, সহোদর ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, পিতৃব্য (চাচা) বা চাচাতো ভাই এই দায়িত্ব পালনের অধিকারী। মাহরাম আত্মীয়দের অগ্রাধিকার প্রদানের পেছনে সুগভীর হিকমত রয়েছে:
- শারীরিক ও নৈতিক সুরক্ষা: মাহরাম আত্মীয়ের সাথে কনের পর্দার বিধান শিথিল। ফলে কনে কোনো জড়তা ছাড়াই তার প্রতিনিধিকে বিবাহের অনুমতি (ইজাজত) প্রদান করতে পারেন। এটি কনের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নৈতিক শুদ্ধতা বজায় রাখে।
- অধিকার সংরক্ষণ ও দরকষাকষি: রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়রা কনের মোহরানা নির্ধারণ, বৈবাহিক শর্তাবলী এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অধিকতর আন্তরিক থাকেন। অনাত্মীয় প্রতিনিধির ক্ষেত্রে এই ধরনের দায়বদ্ধতা অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে।
সামাজিক স্থিতি: মাহরামের মাধ্যমে ওকালত সম্পন্ন হলে পারিবারিক সংহতি বৃদ্ধি পায় এবং ভবিষ্যতে কোনো দাম্পত্য কলহ দেখা দিলে এই আত্মীয়রাই মধ্যস্থতা করার নৈতিক অধিকার রাখেন।
২. অনাত্মীয় ব্যক্তিকে প্রতিনিধি (উকিল) নিয়োগের নেতিবাচক প্রভাব ও শরয়ী নিষেধাজ্ঞা
বাঙালি সমাজে প্রচলিত অনাত্মীয় কাউকে ‘উকিল বাপ’ বানানোর প্রথাটি বেশ কিছু শরয়ী ও সামাজিক জটিলতা সৃষ্টি করে:
- পর্দার বিধানের লঙ্ঘন: ইসলামি শরীয়াহর একটি অলঙ্ঘনীয় মূলনীতি হলো ‘গাইরে মাহরাম’ বা অনাত্মীয় পুরুষের সাথে পর্দার বিধান। কোনো ব্যক্তিকে ‘উকিল বাবা’ সম্বোধন করার মাধ্যমে তিনি কোনোভাবেই শরীয়াহর দৃষ্টিতে মাহরাম হিসেবে গণ্য হন না। ফলে তাঁর সাথে কনের নির্জনে অবস্থান, সরাসরি কথোপকথন বা বিবাহের পর তাঁর সামনে আসা পর্দার বিধানের সুস্পষ্ট পরিপন্থী।
- আকিদাগত বিভ্রান্তি ও কৃত্রিম আত্মীয়তা: ‘বাবা’ একটি পবিত্র ডাক, যা কেবল জন্মদাতা পিতার জন্য সংরক্ষিত। অনাত্মীয় কাউকে এই মর্যাদায় আসীন করা অনেক সময় সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ায় যে, তাঁর সাথে কনের রক্তের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এই ভ্রান্ত বিশ্বাস অনেক সময় ধর্মীয় অনুশাসন পালনে শিথিলতা তৈরি করে।
পালক প্রথার আদল: পবিত্র কুরআনের সূরা আহজাবের ৪ ও ৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা পালক পুত্রের পিতৃত্বের অধিকার নাকচ করে দিয়েছেন। কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী: “তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকো; আল্লাহর নিকট এটাই অধিক ন্যায়সঙ্গত” (সূরা আহজাব: ৫)। কৃত্রিমভাবে কাউকে পিতা হিসেবে সাব্যস্ত করা ইসলামি আকিদার সাথে সাংঘরিক।
৩. ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত ও প্রামাণিক বিশ্লেষণ:
বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও সাহাবায়ে কেরামের বিবাহসমূহ পর্যবেক্ষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, তাঁরা সর্বদা নিকটাত্মীয় বা যোগ্য অভিভাবকদেরই এই পবিত্র কাজের জন্য মনোনীত করেছেন।
ক. সাইয়্যেদা ফাতিমা (রা.) ও আলী (রা.)-এর বিবাহ
রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং তাঁর আদরের কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর অভিভাবক হিসেবে আলী (রা.)-এর প্রস্তাব বিবেচনা ও গ্রহণ করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক বিবাহের ক্ষেত্রে কোনো তৃতীয় পক্ষের ওকালতির নজির পাওয়া যায় না। এটি প্রমাণ করে যে, অভিভাবক নিজেই যখন উপস্থিত থাকেন, তখন অন্য কাউকে উকিল বানানোর কোনো প্রয়োজন বা ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই।
খ. উম্মে হাবিবা (রা.) ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিবাহ
উম্মে হাবিবা (রা.) যখন হাবশায় হিজরত করেছিলেন, তখন তাঁর পিতা আবু সুফিয়ান (রা.) মক্কায় অবস্থান করছিলেন এবং তিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। এমতাবস্থায়, উম্মে হাবিবা (রা.)-এর পক্ষ থেকে আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশী (রা.) ওকালতের দায়িত্ব পালন করেন। ঐতিহাসিক এই প্রেক্ষাপটে নাজ্জাশী (রা.)-এর ভূমিকাটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কেবল কনের অভিভাবকহীনতায় তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেননি, বরং তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকেও ওকালত করে মোহরানা প্রদান করেছিলেন। এই দ্বিমুখী ওকালত ও দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি কনের অভিভাবকহীন অবস্থায় একজন যোগ্য মুসলিম ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছিলেন। সূত্র: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া।
৪. হানাফি মাজহাব ও ফিকহ শাস্ত্রের গভীরতর দৃষ্টিভঙ্গি
ফিকহ শাস্ত্রের ইমামগণ বিবাহের ওকালতকে একটি আইনি প্রতিনিধিত্ব (Agency) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.): হানাফি মাজহাবের মতে, বিবাহের উকিল মূলত কনের সম্মতির সংবাদ বরের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একজন বিশ্বস্ত বার্তাবাহক বা ‘মুদাব্বির’। ওকালত চুক্তির মাধ্যমে কোনো নতুন বৈবাহিক নিষেধাজ্ঞা (Prohibited relationships) তৈরি হয় না। অর্থাৎ, উকিল হওয়ার কারণে ওই ব্যক্তি কনের পরিবারের সদস্য হয়ে যান না। রেফারেন্স: হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ; ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) এর ‘কিতাবুল আসল’ এবং আল্লামা কাসানী (রহ.)-এর ‘বাদায়েউস সানায়ে’।
ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি ও রদ্দুল মুহতার: এই প্রামাণিক গ্রন্থসমূহে সতর্ক করা হয়েছে যে, যদি কোনো অনাত্মীয় ব্যক্তি উকিল হয়, তবে বিবাহের অনুমতি নেওয়ার সময় কনেকে অবশ্যই পর্দার আড়াল থেকে কথা বলতে হবে। ওকালতির অজুহাতে পর্দার বিধান শিথিল করাকে ‘ফাসেকী’ বা পাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
৫. নিকটাত্মীয়কে উকিল নির্বাচনের সমাজতাত্ত্বিক ও আইনি গুরুত্ব
১. অবিচ্ছিন্ন উত্তরাধিকার: ইসলামি উত্তরাধিকার আইনে (মিরাস) ওকালতের কোনো প্রভাব নেই। অনাত্মীয় উকিল মারা গেলে কনে তাঁর সম্পত্তির কোনো অংশ পায় না, আবার কনে মারা গেলে উকিল কোনো অংশ পান না। পক্ষান্তরে, বাবা বা ভাই উকিল হলে তাঁরা উত্তরাধিকার সূত্রে পরস্পর সম্পর্কিত থাকেন।
২. পারিবারিক শৃঙ্খলা: বিবাহের পর অনেক সময় দাম্পত্য জীবনে অমীমাংসিত সমস্যা দেখা দেয়। অনাত্মীয় ‘উকিল বাপ’ অনেক সময় এই সমস্যার দায়ভার নিতে চান না। কিন্তু বাবা বা ভাই হলে তাঁরা কনের সারাজীবনের অভিভাবক হিসেবে পাশে থাকেন।
৩. বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রভাব রোধ: ‘উকিল বাপ’ প্রথাটি মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের কিছু অমুসলিম সংস্কৃতির অনুকরণে মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছে। ইসলামি জীবনব্যবস্থায় ‘ধর্ম বাপ’ বা ‘উকিল বাপ’ বলে কোনো স্বীকৃত মাধ্যম নেই। সুন্নাহর সঠিক চর্চা এই ধরনের বিজাতীয় প্রভাব থেকে মুসলিম সমাজকে রক্ষা করে।
সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ
উপরিউক্ত ঐতিহাসিক দলিল এবং ফিকহী বিশ্লেষণের মাধ্যমে এটি দ্বিধাহীনভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামি বিবাহ ব্যবস্থায় ‘উকিল বাপ’ নামক কোনো স্থায়ী বা রক্ত সম্পর্কহীন আত্মীয়তার অস্তিত্ব নেই। বিবাহের মতো একটি পবিত্র ইবাদত ও আইনি চুক্তিকে লৌকিকতামমুক্ত রাখা ঈমানের দাবি।
সুপারিশসমূহ:
১. বিবাহের ওকালতি বা অভিভাবকত্বের দায়িত্ব সর্বদা কনের নিকটতম মাহরাম আত্মীয়দের (পিতা, ভাই, চাচা) প্রদান করা উচিত।
২. যদি বিশেষ প্রয়োজনে কোনো অনাত্মীয়কে উকিল নিয়োগ করতেই হয়, তবে তাঁকে কেবল ‘প্রতিনিধি’ হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং পর্দার বিধান কঠোরভাবে বজায় রাখতে হবে।
৩. বিবাহের খুতবা এবং আনুষ্ঠানিকতায় ‘উকিল বাপ’ পরিভাষাটি পরিহার করে ‘কনের প্রতিনিধি’ বা ‘ওয়াকিল’ শব্দটি ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয়। উকিল বাপ বলতে শরীয়াভিত্তিক কোনো শব্দই নেই। এই সামাজিক সচেতনতা মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য মসজিদের খতিব ও ইমামগণের খুতবায় আলোচনার পাশাপাশি বিবাহ নিবন্ধক (কাজী) সাহেবদেরও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন, যাতে তারা এই পরিভাষাটির পরিবর্তে শরয়ী পরিভাষা ব্যবহারে উৎসাহিত হন।
সুন্নাহর সঠিক অনুসরণের মাধ্যমেই একটি আদর্শ ও বরকতময় মুসলিম পরিবার গঠন করা সম্ভব।