Table of Contents
বাঙালি সমাজে প্রতি বছর ৯ই ডিসেম্বর তারিখটি বেশ ঘটা করেই পালন করা হয়। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ‘বেগম রোকেয়া দিবস’ হিসেবে চিহ্নিত। পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে সেমিনার, টকশো থেকে শুরু করে নারীবাদী মঞ্চ সর্বত্রই তাকে ‘নারী জাগরণের অগ্রদূত’, ‘মহীয়সী নারী’ এবং ‘শিক্ষার আলোকবর্তিকা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আমাদের মগজে ছোটবেলা থেকেই গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে, অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে মুসলিম নারীদের টেনে তুলে আলোর মুখ দেখিয়েছিলেন এই নারী। কিন্তু ইতিহাসের গতানুগতিক বয়ান প্রায়শই সত্যের প্রকৃত রূপটিকে আড়াল করে রাখে। আবেগের মোড়কে মুড়ে রাখা এই ঐতিহাসিক চিত্রের পেছনে লুকিয়ে আছে এক ইসলামবিরোধী, পশ্চিমা উপনিবেশিক চিন্তাধারার সযত্ন লালন।
আমরা যাকে মুসলিম নারী জাগরণের মশালবাহী বলে মনে করি, তার প্রকৃত বিশ্বাস, দর্শন এবং উদ্দেশ্য কি আসলেই মুসলিমদের হিতাকাঙ্ক্ষী ছিল? নাকি তথাকথিত প্রগতিশীলতা এবং নারীমুক্তির মোড়কে তিনি ইসলামি মূল্যবোধ, শরিয়াহ এবং খোদ মুসলিম জাতিসত্তার বিরুদ্ধেই এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন? তিনি কি আসলেই মুসলিম ছিলেন, নাকি মুসলিম নামধারী এক ইসলামবিদ্বেষী, যিনি তার বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিকে ইসলামের মূল আকিদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ব্যবহার করেছিলেন?
আজকের এই প্রবন্ধে আমরা প্রচলিত আবেগ ও ভুল ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে উঠে দলিল, দস্তাবেজ এবং খোদ বেগম রোকেয়ার নিজস্ব লেখনীর আয়নায় তার প্রকৃত রূপটি উন্মোচনের চেষ্টা করব। এটি কোনো অন্ধ সমালোচনা নয়, বরং রোকেয়া রচনাবলির এবং তার ইসলামবিরোধী দর্শনের নির্মোহ ‘পোস্টমর্টেম’। আমরা রোকেয়ার প্রতিটি আপত্তিকর উক্তির বিপরীতে কুরআনের আয়াত এবং হাদিসের অকাট্য দলিলভিত্তিক জবাব পেশ করার চেষ্টা করব।
আভিজাত্যের আড়ালে ঔপনিবেশিক আনুগত্য ও সমাজ বাস্তবতা
বেগম রোকেয়াকে সঠিকভাবে বোঝার জন্য তার ব্যক্তিগত পরিচয়, পারিবারিক অবস্থান এবং তৎকালীন ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপট জানা অত্যাবশ্যক। রোকেয়া ছিলেন এক ধনাঢ্য ‘জমিদার’ বংশের কন্যা। তার স্বামী সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং ‘রয়েল এগ্রিকালচারাল সোসাইটি’র মেম্বার। এই পরিচয়টি উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সে সময় ভারতবর্ষের মুসলিমরা মূলত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল:
১. স্বাধীনতাকামী ও ইসলামি সংস্কৃতি রক্ষাকারী মুসলিম জনতা: যারা ব্রিটিশ শোষণ, নীলকরদের অত্যাচার এবং তাদের দোসর জমিদারদের বিরুদ্ধে জীবনবাজি রেখে লড়াই করছিলেন। তারা নিজেদের ঈমান-আকিদা, শরিয়াহ এবং সংস্কৃতি রক্ষায় ব্রিটিশ শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে বর্জন করে ঐতিহ্যবাহী মক্তব-মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা ধরে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন।
২. ব্রিটিশ অনুগত ও সুবিধাভোগী অভিজাত শ্রেণি: এই দলে ছিলেন জমিদার, নব্য শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণি এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের উচ্চপদের কর্মকর্তারা। তারা নিজেদের স্বার্থরক্ষা, পদক প্রাপ্তি এবং আভিজাত্য বজায় রাখতে ব্রিটিশদের প্রতি ছিলেন চরমভাবে আনুগত্যশীল। এদের কাছে ব্রিটিশদের আধুনিকতা ছিল অনুকরণীয়, আর নিজেদের ধর্ম ও সংস্কৃতি ছিল ‘পশ্চাৎপদ’।
বেগম রোকেয়া এবং তার স্বামী ছিলেন সুস্পষ্টভাবেই এই দ্বিতীয় দলভুক্ত। তারা ব্রিটিশ রাজের প্রতি চরমভাবে অনুগত ছিলেন এবং তাদের চিন্তা-চেতনা ছিল পুরোদস্তুর ঔপনিবেশিক মানসিকতা (Colonial Mindset) দ্বারা প্রভাবিত। তারা এমন এক সময়ে নারী শিক্ষার কথা বলছিলেন, যখন ব্রিটিশরা পরিকল্পিতভাবে বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে মুসলিম জাতিকে মূর্খতা ও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
শিক্ষার প্রকৃত চিত্র ও ব্রিটিশ ষড়যন্ত্রের বিশ্লেষণ
আমাদেরকে শেখানো হয় যে, তখন মুসলিমরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল কারণ তারা নিজেরা গোঁড়া ছিল এবং নারীদের শিক্ষার সুযোগ দিত না। কিন্তু ইতিহাস সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জেফরি সাচস (Jeffrey Sachs)- এর গবেষণায় উঠে এসেছে, ব্রিটিশরা তাদের উপনিবেশগুলো থেকে কেবল সম্পদ লুণ্ঠনই করেনি, বরং সেখানকার বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ডও ভেঙে দিয়েছিল। ১৭৬৫ সালে বাংলায় প্রায় ৮০ হাজার মক্তব ও মাদ্রাসা ছিল। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলার চার ভাগের এক ভাগ জমি লাখেরাজ (করমুক্ত) হিসেবে বরাদ্দ ছিল। এই লাখেরাজ জমিদারি প্রথার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষাকে সহজলভ্য করেছিল।
কিন্তু ব্রিটিশ বেনিয়া এবং তাদের দোসর হিন্দু জমিদাররা ১৭৯৩ সালের রেগুলেশন-১৯, ১৮১৯ সালের রেগুলেশন-২ এবং ১৮২৮ সালের ‘রিজামসান ল’ (লাখেরাজ ভূমি পুনঃগ্রহণ আইন) এর মাধ্যমে এই সম্পত্তিগুলো বাজেয়াপ্ত করে এবং ইজারা দিয়ে দেয়। ফলে মাত্র ২০০ বছরের ব্যবধানে, ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মাদ্রাসার সংখ্যা ৮০ হাজার থেকে কমে দুই হাজারের নিচে নেমে আসে। মুর্শিদাবাদ জেলায় (উইলিয়াম অ্যাডামের রিপোর্ট) দেখা গিয়েছিল, ১০৮০ জন ছাত্রের মধ্যে মুসলিম ছাত্র ছিল মাত্র ৮২ জন। এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, মুসলিমরা তখন শিক্ষাবিমুখ ছিল না, বরং তাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।
বেগম রোকেয়া যখন শিক্ষার কথা বলছিলেন, তখন তিনি এই ধ্বংসপ্রাপ্ত ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কথা বলেননি। তিনি মুসলমানদের এই অধপতনের কারণ অনুসন্ধান করেননি। বরং তিনি ব্রিটিশদের প্রবর্তিত সেই সেক্যুলার ও ভোগবাদী শিক্ষারই প্রচারক ছিলেন, যা মুসলিমদের তাদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং ব্রিটিশ রাজের অনুগত কেরানি তৈরি করে। মুসলিম আলেমরা বা দেওবন্দের মতো প্রতিষ্ঠানের আলেমরা ব্রিটিশদের এই শিক্ষাকে বর্জন করেছিলেন কারণ তারা জানতেন, এই শিক্ষা কেবল জ্ঞানের আদান-প্রদান নয়, এর মাধ্যমে ব্রিটিশদের কুফরি সংস্কৃতি, রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থাও প্রবেশ করবে। রোকেয়া ব্রিটিশদের সেই এজেন্ডাকেই ‘আলো’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যা মুসলিম জাতির স্বকীয়তাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল।
ইসলাম বিদ্বেষ ও নবীদের প্রতি চরম কটাক্ষের প্রমাণ
বেগম রোকেয়াকে ‘মুসলিম’ নারী জাগরণের অগ্রদূত বলা হলেও, তার লেখনীতে আল্লাহ, রাসুল (সা.) এবং আসমানি কিতাব সম্পর্কে যে ধরনের মন্তব্য পাওয়া যায়, তা কোনো ইমানদার মুসলমানের পক্ষে করা অসম্ভব। তিনি মূলত নিজেকে একজন সংস্কারক নয়, বরং ধর্মবিদ্বেষী হিসেবেই প্রকাশ করেছেন।
হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও শরিয়াহ আইনকে ব্যঙ্গ ও অপব্যাখ্যা
রোকেয়া তার ‘রচনাবলী’তে সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ব্যঙ্গ করেছেন এবং শরিয়াহ আইনকে মানুষের তৈরি বলে দাবি করেছেন। তিনি লিখেছেন:
“তারপর মহাত্মা মহম্মদ আইন প্রস্তুত করিলেন যে, ‘রমণী সর্ব্বদাই নরের অধীনা থাকিবে, বিবাহের পূর্বে পিতা কিংবা ভ্রাতার অধীনা, বিবাহের পর স্বামীর অধীনা, স্বামী অভাবে পুত্রের অধীনা থাকিবে।’ আর মূর্খ নারী নত মস্তকে ঐ বিধান মানিয়া লইল।” (সূত্র: রোকেয়া রচনাবলী, পৃষ্ঠা ৬১১, ২০০৬ সংস্করণ)
রোকেয়া রাসুল (সা.)-কে ‘নবী’ বা ‘রাসুল’ না বলে ‘মহাত্মা মহম্মদ’ বলেছেন। এটি খ্রিস্টান মিশনারি এবং প্রাচ্যবিদদের ব্যবহৃত একটি কৌশল। তারা রাসুল (সা.)-কে একজন সাধারণ সমাজ সংস্কারক বা আইন প্রণেতা হিসেবে দেখত, নবী হিসেবে নয়। রোকেয়া সেই ইসলামবিদ্বেষী সুরেই কথা বলেছেন, যা তার ঈমানের মৌলিক দুর্বলতা প্রমাণ করে। রোকেয়া দাবি করেছেন, মুহাম্মদ (সা.) আইন ‘প্রস্তুত করিলেন’। অর্থাৎ, তার মতে এই বিধান আল্লাহর তরফ থেকে নাজিল হওয়া ‘ওহি’ নয়, বরং মুহাম্মদের (সা.) নিজস্ব তৈরি করা বিধান। ইসলামের মৌলিক আকিদা হলো, রাসুল (সা.)-এর কথা ও কাজ আল্লাহর নির্দেশের বাইরে নয়। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন:
“সে তার নিজ খেয়াল-খুশী থেকে কিছু বলে না। এটা তো খালেস ওহী, যা তাঁর কাছে পাঠানো হয়।” (সূরা আন-নাজম: ৩-৪)
“এবং (হে নবী!) আমি তোমাকে সমস্ত মানুষের জন্য একজন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপেই পাঠিয়েছি, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ বুঝছে না।” (সূরা সাবা ৩৪:২৮)
“এটি এমন কিতাব, যার মধ্যে কোনও সন্দেহ নেই। এটা হিদায়াত এমন ভীতি অবলম্বনকারীদের জন্য” (সূরা বাকারা ০২:০২)
“(হে নবী!) নিশ্চয়ই আমি তোমাকে সত্যসহ এভাবে প্রেরণ করেছি যে, তুমি (জান্নাতের) সুসংবাদ দেবে এবং (জাহান্নাম সম্পর্কে) ভীতি প্রদর্শন করবে। যেসব লোক (স্বেচ্ছায়) জাহান্নাম (এর পথ) বেছে নিয়েছে, তাদের সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না।” (সূরা বাকারা ০২:১১৯)
রাসুল (সা.)-এর আনুগত্য হলো আল্লাহর আনুগত্য। রোকেয়া এই মৌলিক বিশ্বাসকে সরাসরি আঘাত করেছেন।
ইসলামে নারীরা পুরুষের (পিতা, স্বামী বা পুত্র) অধীনে থাকে না, বরং তাদের ‘অভিভাবকত্বে’ (Protection and Provision) থাকে। আল্লাহ পুরুষকে কাওয়াম (দায়িত্বশীল) করেছেন। আল্লাহ বলেন:
“পুরুষ নারীদের অভিভাবক, যেহেতু আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু পুরুষগণ নিজেদের অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে। সুতরাং সাধ্বী স্ত্রীগণ অনুগত হয়ে থাকে, (পুরুষের)অনুপস্থিতিতে আল্লাহ প্রদত্ত হিফাজতে (তার অধিকারসমূহ) সংরক্ষণ করে। আর যে সকল স্ত্রীর ব্যাপারে তোমরা অবাধ্যতার আশংকা কর, (প্রথমে) তাদেরকে বুঝাও এবং (তাতে কাজ না হলে) তাদেরকে শয়ন শয্যায় একা ছেড়ে দাও এবং (তাতেও সংশোধন না হলে) তাদেরকে প্রহার করতে পার। অতঃপর তারা যদি তোমাদের আনুগত্য করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনও (ব্যবস্থা গ্রহণের) পথ খুঁজো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকলের উপর, সকলের বড়।” (সূরা নিসা: ৩৪)
এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে পুরুষরা ভরণপোষণকারী (Provider) এবং সুরক্ষাকারী (Protector)। রোকেয়া এই পবিত্র দায়িত্বশীলতার ব্যবস্থাকে দাসত্ব বলে তুচ্ছ করেছেন এবং যারা এই বিধান মেনে নেয়, সেই ঈমানদার নারীদের তিনি ‘মূর্খ’ বলে গালি দিয়েছেন। এটি লক্ষ লক্ষ মুসলিম নারীর প্রতি তার চরম ঘৃণা ও অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ।
সমস্ত আসমানি কিতাব ও নবীদের অস্বীকারের ধৃষ্টতা
রোকেয়া কেবল রাসুল (সা.)-কে নয়, সকল আসমানি কিতাব ও নবুওয়াতকেই অস্বীকার করেছেন। তিনি ধর্মগ্রন্থগুলোকে পুরুষদের তৈরি চক্রান্তের দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন:
“তোমরা দেখিতেছ এই ধৰ্ম্মশাস্ত্রগুলি পুরুষরচিত বিধি ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে। মুনিদের বিধানে যে কথা শুনিতে পাও, কোন স্ত্রী মুনির বিধানে হয়ত তাহার বিপরীত নিয়ম দেখিতে পাইতে। ধৰ্ম্মগ্রন্থসমূহ ঈশ্বরপ্রেরিত বা ঈশ্বরাদিষ্ট নহে। যদি ঈশ্বর কোন দূত রমণীশাসনের নিমিত্ত প্রেরণ করিতেন, তবে সে দূত কেবল এসিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকিতেন না। দূতগণ ইউরোপে যান নাই কেন? আমেরিকা এবং সুমেরু হইতে কুমেরু…” (সূত্র: রোকেয়া রচনাবলী: পৃষ্ঠা ৫৯৪, ৬১০, ৬১১)
১. ধর্মগ্রন্থ ‘ঈশ্বরপ্রেরিত নহে’: এই বক্তব্য সরাসরি কুফরি। ইসলামের অন্যতম রুকন হলো আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে কুরআন বা ধর্মগ্রন্থগুলো মানুষের তৈরি (পুরুষরচিত), সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়।
২. নবুওয়াতের সর্বজনীনতাকে অস্বীকার: রোকেয়া প্রশ্ন তুলেছেন, নবীরা কেন শুধু এশিয়ায় এলেন? এটি তার অজ্ঞতা এবং চরম বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে স্পষ্টভাবে বলেছেন:
“নিশ্চয়ই আমি প্রত্যেক উম্মতের ভেতর কোনও না কোনও রাসূল পাঠিয়েছি এই পথনির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগূতকে পরিহার কর। তারপর তাদের মধ্যে কতক তো এমন ছিল, যাদেরকে আল্লাহ হিদায়াত দান করেছেন আর কতক ছিল এমন, যাদের উপর বিপথগামিতা অবধারিত হয়ে গেছে। সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে একটু পরিভ্রমণ করে দেখ, (নবীদেরকে) অস্বীকারকারীদের পরিণতি কী হয়েছে?” (সূরা আন-নাহল: ৩৬)
“আমি তোমাকে সত্যবাণীসহ প্রেরণ করেছি একজন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে। এমন কোন জাতি নেই, যাদের কাছে কোন সতর্ককারী আসেনি।” (সূরা ফাতির: ২৪)
আল্লাহ সব জনপদেই নবী পাঠিয়েছেন, কিন্তু সব নবীর নাম কুরআনে উল্লেখ করা হয়নি। রোকেয়া ইউরোপীয় নাস্তিকদের যুক্তি দিয়ে নবুওয়াত ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
৩. নারী মুনির বিপরীত নিয়ম: রোকেয়া নারীর শাসনের নামে উল্টো বিধানের কথা বলেছেন, যা কেবল মানব-রচিত আইনের ক্ষেত্রেই সম্ভব, আল্লাহর শাশ্বত বিধানে নয়। আল্লাহর বিধান সর্বকালের, সর্বযুগের জন্য সমান ও ভারসাম্যপূর্ণ।
হযরত ঈসা (আ.) ও ইঞ্জিল সম্পর্কে বিষোদগার ও মিথ্যাচার
বেগম রোকেয়ার ইসলাম বিদ্বেষের প্রমাণ শুধু ইসলামে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি হযরত ঈসা (আ.)-কেও আক্রমণ করেছেন, যা প্রমাণ করে তিনি সব ঐশী ধর্মেই বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি লিখেছেন:
“ক্রমে জগতের বুদ্ধি বেশী হওয়ায় সুচতুর প্রতিভাশালী পুরুষ দেখিলেন যে, ‘পয়গম্বর’ বলিলে আর লোকে বিশ্বাস করে না। তখন মহাত্মা ঈশা আপনাকে দেবতার অংশবিশেষ (ঈশ্বরপুত্র !) বলিয়া পরিচিত করিয়া ইঞ্জিল গ্রন্থ রচনা করিলেন। তাহাতে লেখা হইল, ‘নারী পুরুষের সম্পূর্ণ অধীনা—নারীর সম্পত্তিতে স্বামী সম্পূর্ণ অধিকার।’ আর বুদ্ধি-বিবেকহীনা নারী তাই মানিয়া লইল।”
১. ঈসা (আ.)-কে ‘সুচতুর পুরুষ’ বলা: রোকেয়া এখানে একজন উলুল আযম পয়গম্বরকে ‘সুচতুর’ (ধূর্ত) এবং প্রতারক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ঈসা (আ.) ক্ষমতা লাভের জন্য নিজেকে ‘খোদার পুত্র’ দাবি করেছেন। (নাউজুবিল্লাহ)। এটি কুরআনের প্রতি তীব্র বিদ্বেষের ফল, যেখানে ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর সম্মানিত নবী বলা হয়েছে।
২. ইঞ্জিলকে ‘রচনা’ বলা: তিনি দাবি করেছেন, ইঞ্জিল আল্লাহর কিতাব নয়, বরং ঈসা (আ.) এটি নিজে ‘রচনা’ করেছেন। এটি সরাসরি কুরআনের আয়াতের অস্বীকার। আল্লাহ বলেন:
“তিনি তোমার প্রতি সত্যসম্বলিত কিতাব নাযিল করেছেন, যা তার পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সমর্থন করে এবং তিনিই তাওরাত ও ইনজীল নাযিল করেছেন” (সূরা আলে ইমরান: ৩)
৩. নারীর সম্পত্তিতে স্বামীর সম্পূর্ণ অধিকারের মিথ্যাচার: রোকেয়া ইঞ্জিলকে বিকৃত করে লিখেছেন যে, তাতে নাকি লেখা আছে ‘নারীর সম্পত্তিতে স্বামী সম্পূর্ণ অধিকার’। এটি চরম মিথ্যাচার। ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে সম্পদের অধিকার দিয়েছে। ইসলামে, স্বামী স্ত্রীর সম্পদের মালিক হতে পারে না, কিন্তু স্ত্রী স্বামীর সম্পদের অংশীদার হয়। অথচ রোকেয়া ইসলামকে খারাপ প্রমাণ করতে গিয়ে অন্য আসমানি কিতাবের ওপরও মিথ্যা আরোপ করেছেন।
৪. ঈসা (আ.)-এর প্রতি ঈমান: একজন মুসলিমের জন্য ঈসা (আ.)-কে নবী এবং ইঞ্জিলকে আসমানি কিতাব হিসেবে বিশ্বাস করা ফরজ। আল্লাহ বলেন:
“বলে দাও, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি, আমাদের উপর যে কিতাব নাযিল করা হয়েছে তার প্রতি, ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও (তাঁদের) বংশধরের প্রতি যা (যে হিদায়াত) নাযিল করা হয়েছে তার প্রতি এবং মূসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীগণকে তাঁদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা দেওয়া হয়েছে তার প্রতি। আমরা তাঁদের (উল্লিখিত নবীদের) মধ্যে কোনও পার্থক্য করি না এবং আমরা তাঁরই (এক আল্লাহরই) সম্মুখে নতশির।” (সূরা আলে ইমরান: ৮৪)
বেগম রোকেয়া এই সকল মৌলিক বিশ্বাসকে পায়ে ঠেলে দিয়ে একজন নবীকে ‘প্রতারক’ বলেছেন।
হযরত আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) প্রসঙ্গ এবং ইবলিসি দর্শনের সাদৃশ্য
বেগম রোকেয়া তার নারীবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সৃষ্টির ইতিহাসকেও বিকৃত করেছেন। তিনি শয়তানের প্ররোচনা এবং আল্লাহর অবাধ্যতাকে ‘নারীর কৃতিত্ব’ হিসেবে জাহির করেছেন। তিনি লিখেছেন:
“নারীজাতি কি বাস্তবিক হীনবুদ্ধি? না, বরং রমণী প্রতিভার আদি অধীশ্বরী। ইহা সর্ববাদিসম্মত যে নারীই প্রথমে জ্ঞানফল চয়ন ও ভক্ষণ করিয়াছিল, পরে পুরুষ তাঁহার (উচ্ছিষ্ট!) প্রদত্ত ফল প্রাপ্ত হইয়াছেন।”
১. নিষিদ্ধ ফলকে ‘জ্ঞানফল’ বলা ও ইবলিসের অনুসরণ: আল্লাহ আদম ও হাওয়াকে একটি নির্দিষ্ট গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু ইবলিস তাদেরকে ধোঁকা দিয়ে বলেছিল, এই ফল খেলে তারা অনন্ত জীবন বা ফেরেশতা হয়ে যাবে। রোকেয়া এখানে ইবলিসের ভাষ্যটিই গ্রহণ করেছেন। তিনি আল্লাহর নিষেধ অমান্য করাকে ‘জ্ঞান অর্জন’ বা ‘প্রতিভা’ হিসেবে দেখিয়েছেন। আল্লাহ বলেন:
“অতঃপর (এই ঘটল যে,) শয়তান তাদের অন্তরে কুমন্ত্রণা দিল, যাতে তাদের লজ্জাস্থান, যা তাদের থেকে গোপন রাখা হয়েছিল, তাদের পরস্পরের সামনে প্রকাশ করতে পারে। ৯ সে বলতে লাগল, তোমাদের প্রতিপালক অন্য কোনও কারণে নয়; বরং কেবল এ কারণেই এই গাছ থেকে তোমাদেরকে বারণ করেছিলেন, পাছে তোমরা ফিরিশতা হয়ে যাও কিংবা তোমরা স্থায়ী জীবন লাভ কর।
সে তাদের সামনে কসম খেয়ে বলল, বিশ্বাস কর, আমি তোমাদের কল্যাণকামীদের একজন।
এভাবে সে উভয়কে ধোঁকা দিয়ে নিচে নামিয়ে দিল। সুতরাং যখন তারা সে গাছের স্বাদ গ্রহণ করল, তখন তাদের উভয়ের লজ্জাস্থান উভয়ের কাছে প্রকাশ হয়ে গেল। অনন্তর তারা জান্নাতের কিছু পাতা (জোড়া দিয়ে) নিজেদের শরীরে জড়াতে লাগল। তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে ডেকে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে এ গাছ থেকে বারণ করিনি এবং তোমাদেরকে বলিনি, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?” (সূরা আল-আরাফ: ২০-২২)
২. হাওয়া (আ.)-কে ‘আদি অধীশ্বরী’ প্রমাণ: রোকেয়া বাইবেলের বিকৃত আকিদা থেকে ধার করে দাবি করেছেন যে, হাওয়া (আ.) আগে ফল খেয়েছেন এবং আদম (আ.) তার ‘উচ্ছিষ্ট’ খেয়েছেন। এটি চরম মিথ্যাচার। কুরআন এই ঘটনার জন্য উভয়কে সমানভাবে দায়ী করেছে এবং উভয়েই অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চেয়েছেন। কুরআনের ভাষায়, “অতঃপর (এই হল যে,) শয়তান তাদেরকে সেখান থেকে টলিয়ে দিল এবং তাঁরা যার (যে সুখের) ভেতর ছিল তা থেকে তাঁদেরকে বের করে ছাড়ল। আমি (আদম, তার স্ত্রী ও ইবলিসকে) বললাম, এখন তোমরা সকলে এখান থেকে বের হয়ে যাও। তোমরা একে অন্যের শত্রু হবে। আর তোমাদের জন্য পৃথিবীতে (স্থিরীকৃত) আছে একটা কাল পর্যন্ত অবস্থান ও কিঞ্চিৎ ভোগ।” (সূরা বাকারা: ৩৬)
আরেকটি কথা হলো কুরআনে জ্ঞানফল নামে কোনো ফলের কথা উল্লেখ নেই। এই কথাও বাইবেল থেকে নেয়া যেখানে বলা হয়েছে, “কিন্তু ভালোমন্দের জ্ঞানদায়ী গাছের ফল তুমি অবশ্যই খেয়ো না। যদি সেই গাছের ফল খাও, তবে তুমি নিশ্চয় মারা যাবে।” – বাইবেল, আদিপুস্তক ২/১৭
৩. আদম (আ.)-কে অপমান: তিনি মানবজাতির পিতা এবং প্রথম নবী আদম (আ.)-কে ‘উচ্ছিষ্টভোগী’ বলে অপমান করেছেন। একজন মুসলিমের পক্ষে তার আদি পিতা এবং নবী সম্পর্কে এমন জঘন্য শব্দ চয়ন করা অকল্পনীয়। তিনি নারীবাদী ক্ষোভ মেটাতে গিয়ে নবীর সম্মান ভূলুণ্ঠিত করেছেন।
পর্দা ব্যবস্থার প্রতি চরম বিদ্বেষ ও উপহাস
বেগম রোকেয়ার লেখনীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল ইসলামের পর্দা ব্যবস্থা। তিনি পর্দা বা হিজাবকে নারীর সম্মান বা সুরক্ষার প্রতীক মনে করতেন না, বরং একে দেখতেন দাসত্বের চরম নিদর্শন হিসেবে। তার ‘অবরোধবাসিনী’ গ্রন্থে তিনি পর্দা প্রথাকে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ভাষায় আক্রমণ করেছেন:
“…..চুপ কর, ঐ দেখ মক্কা মদিনা যায়,-ঐ। ঘেরাটোপ জড়ানো জুজুবুড়ী, ওরাই মক্কা মদিনা। …চুপ কর। এই রাত্রিকালে ওগুলো ভূত না হয়ে যায় না। বাতাসে বোকা নেকাব একটু আধটু উড়িতে দেখিলে বলিত- ‘দেখরে দেখ। ভূতগুলার শুঁড় নড়ে। বাবারে। পালা রে।”(সূত্র: রোকেয়া রচনাবলী: পৃষ্ঠা ৩৮৫, ৩৮৭, ৪০১)
১. পর্দাকে ‘ভূত’ ও ‘জুজুবুড়ি’ বলা: পর্দা করা নারীদের নিয়ে এমন জঘন্য উপহাস এবং টিটকারি কেবল একজন কট্টর ইসলাম বিদ্বেষীর পক্ষেই সম্ভব। তিনি পর্দানশীন নারীদের ‘মক্কা-মদিনা’ বা ‘জুজুবুড়ি’ বলে ব্যঙ্গ করেছেন। অথচ পর্দা আল্লাহ তায়ালার সরাসরি নির্দেশ, যা নারীর সম্মান ও সুরক্ষার প্রতীক। আল্লাহ বলেন:
“হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, তোমার কন্যাদের ও মুমিন নারীদেরকে বলে দাও, তারা যেন তাদের চাদর নিজেদের (মুখের) উপর নামিয়ে দেয়। এ পন্থায় তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আল-আহযাব: ৫৯)
২. আল্লাহর বিধান নিয়ে ঠাট্টা কুফরি: রোকেয়া আল্লাহর এই বিধানকে ‘অবরোধ’ বা ‘বন্দিদশা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইসলামে বিধান নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা কুফরি। আল্লাহ বলেন:
“তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, তারা অবশ্যই বলবে, আমরা তো হাসি-তামাশা ও ফূর্তি করছিলাম। বল, তোমরা কি আল্লাহ, আল্লাহর আয়াত ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে ফূর্তি করছিলে? অজুহাত দেখিও না। তোমরা ঈমান জাহির করার পর কুফরীতে লিপ্ত হয়েছ। আমি তোমাদের মধ্যে এক দলকে ক্ষমা করলেও, অন্য দলকে অবশ্যই শাস্তি দিব। কেননা তারা অপরাধী।” (সূরা আত-তাওবা: ৬৫-৬৬)
রোকেয়া মুসলিম সমাজে নারীর প্রতি বিদ্বেষের বীজ বপন করেছেন, যা আজকের সমাজে হিজাব পরা নারীদের প্রতি বুলিং বা টিটকারির পথ খুলে দিয়েছে।
বিবাহ ও পরিবার ব্যবস্থাকে ‘দাসত্ব’ আখ্যা
বেগম রোকেয়া মুসলিম পারিবারিক কাঠামো এবং বিবাহ ব্যবস্থাকে নারীর জন্য ‘দাসত্ব’ মনে করতেন। তিনি নারীদের উসকে দিয়েছেন পরিবারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে।
তিনি লিখেছেন:
“ভগিনীগণ! তোমরা কি কোনদিন আপনার দুর্দশার বিষয় চিন্তা করিয়া দেখিয়াছ? এই বিংশ শতাব্দীর সভ্যসমাজে আমরা কি, দাসী!! পৃথিবী হইতে দাস ব্যবসায় উঠিয়া গিয়াছে শুনিতে পাই, কিন্তু আমাদের দাসত্ব গিয়াছে কি? আমরা যে নরাধীন সেই নরাধীন! দিদীমাদের মুখে শুনি যে, নারী নরের অধীন থাকিবে, ইহা ঈশ্বরেরই অভিপ্রেত; তিনি প্রথমে পুরুষ সৃষ্টি করিয়াছেন, পরে তাহার সেবা শুশ্রুষার নিমিত্ত রমণীর সৃষ্টি হয়। কিন্তু একথার আমার সন্দেহ আছে। কারণ দিদীমাদের এ জ্ঞান পুরুষের নিকট হইতে গৃহীত। তাহারা ত বলিবেনই যে, রমণী কেবল পুরুষের সুখ শাস্তিদাত্রিরূপে জন্মগ্রহণ করে।” (সূত্র: রোকেয়া রচনাবলি, https://bacbichar.net/2021/06/art.5691.bb/)
১. আনুগত্যকে দাসত্ব বলা এবং সন্দেহ প্রকাশ: রোকেয়া সরাসরি আল্লাহর অভিপ্রায় এবং ইসলামি পরিবার ব্যবস্থার প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। ইসলামে নারী-পুরুষের সম্পর্ক দাস-দাসীর নয়, বরং দয়া, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্মানের। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“তাঁর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই মধ্য হতে স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে গিয়ে শান্তি লাভ কর এবং তিনি তোমাদের পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এর ভেতর নিদর্শন আছে সেই সব লোকের জন্য, যারা চিন্তা-ভাবনা করে।” (সূরা রুম: ২১)
২. পারিবারিক শৃঙ্খলা: ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক দয়া ও ভালোবাসার, কিন্তু পারিবারিক শৃঙ্খলার জন্য আল্লাহ পুরুষকে ‘কাওয়াম’ বা দায়িত্বশীল করেছেন।
“পুরুষরা নারীদের ওপর কর্তৃত্বশীল (দায়িত্বশীল)…” (সূরা নিসা: ৩৪)
এই কাওয়াম অর্থ শোষণ নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সুরক্ষার দায়িত্ব। স্বামী স্ত্রীর সম্পদের মালিক হতে পারে না, কিন্তু স্ত্রী স্বামীর সম্পদের অংশীদার হয়। রোকেয়া এই ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থাটিকে ‘দাসত্ব’ বলে মিথ্যাচার করেছেন।
৩. মায়ের মর্যাদাকে অপমান: তিনি লিখেছেন, “স্বামী অভাবে পুত্রের অধীনা থাকিবে”– এটি নাকি দাসত্ব। অথচ ইসলামে বৃদ্ধ বয়সে মায়ের দেখাশোনা করা সন্তানের জন্য জান্নাত লাভের উপায়। হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, “কুতায়বা ইবনে সাঈদ (রাহঃ) ……… আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলো: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার কাছে কে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার বেশী হকদার? তিনি বললেনঃ তোমার মা। লোকটি বললঃ তারপর কে? নবী (ﷺ) বললেনঃ তোমার মা। সে বললঃ তারপর কে? তিনি বললেনঃ তোমার মা। সে বললঃ তারপর কে? তিনি বললেনঃ তারপর তোমার পিতা। ইবনে শুবরুমা ও ইয়াহয়া ইবনে আইয়ুব আবু যুরআ থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।” (সহীহ বুখারী ৫৫৪৬, আন্তর্জাতিক মান ৫৯৭১) এটি বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম সম্মান। রোকেয়া এই পবিত্র ব্যবস্থাকে দাসত্ব বলে গালি দিয়েছেন এবং বৃদ্ধ মায়েরা যেন পশ্চিমা বিশ্বের মতো নিঃসঙ্গ জীবন কাটায়, সেই প্ররোচনা দিয়েছেন।
৪. অলংকারকে ‘Badge of Slavery’ বলা: তিনি অলংকারকে ‘দাসত্বের চিহ্ন’ বলেছেন। অথচ ইসলামে নারীরা স্বভাবতই সাজসজ্জা করতে পছন্দ করেন এবং এটি তাদের অধিকার। তিনি নারীর ফিতরাত বা স্বভাবজাত প্রবৃত্তিকেও অস্বীকার করেছেন এবং পশ্চিমা উগ্র নারীবাদের চরমপন্থী দর্শনকে গ্রহণ করেছেন।
মুসলিম জাতিসত্তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা (Trojan Horse)
বেগম রোকেয়া যখন ইসলাম ও মুসলিম সমাজকে আক্রমণ করছিলেন, তখন মুসলিম জাতি ইংরেজ ও জমিদারদের দ্বারা নিষ্পেষিত ছিল। এই ক্রান্তিলগ্নে মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক প্রথা এবং পারিবারিক মূল্যবোধকে আক্রমণ করে রোকেয়া প্রকারান্তরে ঔপনিবেশিক এবং ইসলামবিরোধী শক্তির এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করেছেন। তিনি ‘সুলতানার স্বপ্ন’ (Sultana’s Dream)-এর মতো রচনায় চরম পুরুষবিদ্বেষ (Misandry) প্রদর্শন করেছেন, যেখানে তিনি পুরুষদের ‘মর্দানা’য় বন্দী করে রাখার স্বপ্ন দেখেছেন।
আজকের উগ্র নারীবাদ (Radical Feminism) যে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর বেগম রোকেয়াই বুনে গিয়েছিলেন:
- পুরুষবিদ্বেষ: রোকেয়ার দর্শনে পুরুষ মানেই অত্যাচারী, এবং পারিবারিক সম্পর্ক মানেই শোষণ।
- পরিবার ভাঙা: স্বামীর অভিভাবকত্ব অস্বীকার করে পরিবারে ভাঙন সৃষ্টি করা।
- ধর্মহীনতা: ইসলাম ধর্মকে ‘পুরুষরচিত’ আইন বলে আখ্যায়িত করে ধর্মহীনতার পথে নারীদের আহ্বান জানানো।
বেগম রোকেয়ার এসব দর্শন মুসলিম নারীদের জাগিয়ে তোলার পরিবর্তে তাদের ইমান, আমল ও মুসলিম আত্মপরিচয় থেকে দূরে সরিয়ে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বেগম রোকেয়া- আইকন নাকি সতর্কবার্তা?
সামগ্রিক পর্যালোচনায় এবং বেগম রোকেয়ার নিজের লেখনীর অকাট্য উদ্ধৃতি ও তার বিপরীতে কুরআনের আয়াত ও হাদিসের দলিলভিত্তিক জবাবের মাধ্যমে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, বেগম রোকেয়া কখনোই মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরে বেড়ে ওঠা এক ‘ট্রোজান হর্স’ যার উদ্দেশ্য ছিল ছদ্মবেশে মুসলিমদের মূল বিশ্বাসে আঘাত হানা। তার দর্শন ছিল ইসলাম বিরোধী, তার লেখনী ছিল নবীদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ এবং তার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম পারিবারিক কাঠামোকে ধ্বংস করা।
যিনি আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.)-কে অস্বীকার করেন, যিনি কুরআন ও আসমানি কিতাবকে ‘পুরুষের রচনা’ বলেন, যিনি পর্দা ও শালীনতাকে ‘ভূত’ বলে উপহাস করেন, যিনি হযরত ঈসা (আ.)-কে ‘প্রতারক’ বলেন তিনি আর যাই হোক, মুসলিমদের আদর্শ হতে পারেন না। তাকে ‘মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত’ বলাটা মুসলিম জাতির সাথে এক নির্মম পরিহাস।
বেগম রোকেয়ার এই দর্শন তার শারীরিক খর্বতার চেয়েও গুরুতর ছিল। তিনি ইউরোপের চশমা দিয়ে নিজের সমাজকে দেখেছিলেন বলে সবকিছুকে অন্ধকার ও কুসংস্কার মনে করতেন। তিনি মুসলিম নারীদের ঈমান ও আমল ধ্বংস করে তাদের তথাকথিত আধুনিকতার নামে বিপথগামী করতে চেয়েছিলেন।
আজ সময় এসেছে ইতিহাসের এই ভুল পাঠ সংশোধন করার। আমাদের বোনেরা, কন্যারা কাকে অনুসরণ করবেন? যিনি জান্নাতের সর্দারনি হযরত ফাতিমা (রা.), খাদিজা (রা.), আয়েশা (রা.) তাদের? নাকি আল্লাহ ও রাসুলের দুশমন, নবীদের ব্যঙ্গকারী বেগম রোকেয়াকে?
রোকেয়ার লেখনী পাঠ করলে যে কারো ঈমান নড়বড়ে হতে বাধ্য। তাই তাকে বর্জন করা এবং তার প্রকৃত রূপ উন্মোচন করা ঈমানের দাবি। বেগম রোকেয়া কোনো আইকন নন, বরং তিনি এক সতর্কবার্তা; কিভাবে ‘শিক্ষিত’ হওয়ার নামে, আধুনিক হওয়ার নামে মানুষ নিজের দ্বীন, ঈমান ও আত্মপরিচয় হারিয়ে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারে, তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। মুসলিম নারী জাগরণ হতে হবে ইসলামের গণ্ডির ভেতরে, কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে; রোকেয়ার শেখানো নাস্তিক্যবাদ, পুরুষবিদ্বেষ এবং ধর্মহীনতার পথে নয়।
Related Posts Where We Are! Facebook X-twitter Youtube Instagram Whatsapp Other Posts