অন্বেষণ প্রথম খণ্ড নিয়ে যতই বলি, ততই মনে হয় বলা যেন যথেষ্ট হচ্ছে না। বইটি পড়তে সময় অনেকবার মনকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছিলাম যে এখন থামা উচিত, কিন্তু ভাষা, ভাবনার ধারাবাহিকতা, উপস্থাপন ও যুক্তির পরপর ঢেউ এমন ছিল যে থামার সিদ্ধান্তের পথে সংকোচ এসে পড়তেছিল। তাই এক বসায় বইটি শেষ করতে হলো। আর বই প্রেমিক মানেই জানেন একটি বইয়ের কী কী গুণ থাকলে এক বসায় শেষ করার ইচ্ছা হয়!
মজার বিষয় হচ্ছে, আমি দ্বিতীয় খণ্ড শেষ করার পরই প্রথমটি পড়েছি। যা সাধারণত কেউ করেন না, কিন্তু এই দুই খণ্ডই এমন মনোহর বাচনভঙ্গিতে রচিত যে উল্টো পথে পড়েও পাঠ-আনন্দে বিন্দুমাত্র ঘাটতি হয়নি।
লেখক মুহাম্মাদ আল ইবরাহিম- ভাই যখন জানলেন যে আমি দ্বিতীয় খণ্ড পড়ে প্রথমটিও পড়তে আগ্রহী, তখন তিনি সৌজন্যবশত নিজ হাতে বইটি পাঠিয়ে দিলেন। বই পাওয়া সব সময়ই আনন্দের, কিন্তু একজন লেখক তার নিজস্ব পরিশ্রম-গ্লানি ব্যয় করে পাঠকের হাতে তুলে দিলে সেটি শুধু বই নয়, কৃতজ্ঞতার এক বার্তা হয়ে হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। আমার ক্ষেত্রেও তেমনই হয়েছে।
অন্বেষণ কেন পড়বেন?
তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব অনেক সময় ভারী ও দুর্বোধ্য মনে হয়, কিন্তু লেখক তাঁর অভ্যস্ত শব্দভাণ্ডার থেকে সহজ অথচ তাৎপর্যপূর্ণ শব্দ বেছে এমনভাবে সাজিয়েছেন যে পাঠক শুধু পড়েন না, প্রত্যেক লাইনে এক ধরনের উপলব্ধি ছুঁয়ে যান।
প্রশ্ন হতে পারে: এই বইটি কার জন্য? সবার জন্য! যারই হাতে পড়বে, তাঁরই জন্য! যিনি তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ছাত্র তিনি যেমন দিকনির্দেশনা পাবেন, ঠিক তেমনি একজন সাধারণ পাঠকও নিজের বিশ্বাস, উপলব্ধি এবং ঈমানের অবস্থানকে নতুন করে দেখতে সক্ষম হবেন। বইজুড়ে লেখকের ভাষা কখনও যুক্তি, কখনও আবেগ, কখনও গবেষণা, আবার কখনও পল্লীভাষার স্নিগ্ধ স্পর্শে পাঠককে এমনভাবে কাছে টেনে নেয় যে মনে হয় এই বই পড়ার সময় লেখক, চরিত্র এবং পাঠক তিনজনই একই পথের ভ্রমণসঙ্গী।
পড়তে পড়তে অনেক সময় মনে হয়েছে একজন মানুষ কতটা শ্রম, কতটা অধ্যবসায় ও কতটা স্থিরতা নিয়ে এমন একটি গ্রন্থ রচনা করতে পারেন! বিভিন্ন ধর্ম, মতবাদ ও বিশ্বাসের ওপর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, তুলনা, বিশ্লেষণ, সূত্রসংগ্রহ; এসবই বইটিকে শুধু পাঠযোগ্য নয়, মর্যাদাসম্পন্ন করে তুলেছে।
অন্বেষণ কারা পড়বেন?
বইটির আরেক সৌন্দর্য হলো এটি শুধু নির্দিষ্ট কোনো মতবাদকে কেন্দ্র করে উপস্থাপিত হয়নি।
নাস্তিকরা যদি পড়েন; তারা অনেক বহুলচর্চিত যুক্তির বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা ও জবাব পাবেন।
হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা অন্যান্য ধর্মের পাঠকরা পড়লে নিজেদের ধর্মীয় ঐতিহ্য, আচার, ধারণা ও বিশ্বাসের জটিল জায়গাগুলো নতুনভাবে দেখতে পাবেন।
সংসয়বাদীরা পড়লে বুঝতে পারবেন বিভিন্ন ধর্ম কোথায় দাঁড়িয়ে আছে এবং কোন অবস্থান কোথায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
আর সাধারণ পাঠকের জন্য আছে প্রশ্ন, অনুসন্ধান, যুক্তি, রেফারেন্সভিত্তিক প্রমাণ এবং নির্মোহ বিশ্লেষণের বিপুল ভাণ্ডার।
বইয়ের ভিতরে!
বইটির কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন সংসয়বাদী। সত্যের সন্ধানে তিনি নাস্তিক, বাউল, অন্য ধর্মীয় চিন্তাবিদ এবং ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করতে থাকেন। তারা তাদের মতবাদ, বক্তব্য ও বিশ্বাসকে সামনে নিয়ে আসে, কিন্তু লেখকের উপস্থাপনার বুননে তারা নিজেদের অবস্থানে দাঁড়িয়েই মুখোমুখি হয় বাস্তবতার, যুক্তির এবং সত্যের। অনেক সময় তারা নিজেরাই বুঝতে পারে যে তাদের যুক্তির ভিত কোথায় দুর্বল হয়ে পড়ে।
এটাই বইটির সৌন্দর্য; লেখক কোথাও উচ্চকণ্ঠ হননি, বরং যুক্তিকে যুক্তির সামনে দাঁড় করিয়েছেন।
মুহাম্মাদ আল ইবরাহিমের শব্দচয়ন অত্যন্ত পরিমিত, সংবেদনশীল ও গভীর। বইয়ের বিভিন্ন স্থানে আঞ্চলিক কথন সংযোজন পাঠকের কাছে বাস্তবতার ঘ্রাণ এনে দেয়, যেন বইটি শুধুই যুক্তি নয়; এক ধরনের জীবন্ত অভিজ্ঞতা।
ধর্মীয় গবেষণামূলক বইয়ে এমন উপন্যাসিক বর্ণনা পাওয়া সত্যিই বিরল। লেখক তথ্য, বিশ্লেষণ, যুক্তি সবকিছু এক সুতোয় বেঁধে এমনভাবে এগিয়ে নিয়ে যান যে বইটি কখনো তথ্যবহুল, কখনো দার্শনিক, কখনো আত্মিক আবার কখনো সাহিত্যিক হয়ে ওঠে।
বইটির উল্লেখযোগ্য শক্তি হলো বিস্তর রেফারেন্স ও তথ্যসংগ্রহ। শুধু দাবি নয়, প্রমাণও আছে। যারা গবেষণা বা সোর্স যাচাইয়ের কাজ করেন তারা সহজেই বুঝবেন এত বিপুল তথ্য সংগ্রহে কত সময়, ধৈর্য ও শ্রম লাগে। তারপর সেগুলোকে সুশৃঙ্খল উপায়ে বিন্যাস করে উপস্থাপন করা নিঃসন্দেহে অতুলনীয় দক্ষতার দাবি রাখে।
বাংলাদেশে অন্বেষণের মতো বইয়ের গুরোত্ব!
বাংলাদেশে ইসলামী লেখক আছে অনেক, কিন্তু উপন্যাসিক শৈলীতে সত্য-নির্ভর, গবেষণা-সমর্থিত ধর্মীয় গ্রন্থ রচনাকারী খুব কম। ফলে আজও আমাদের অনেক পাঠকের হাতে পড়ে এমন বই যা ইতিহাস বলতে গিয়ে কল্পকথার মত হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষাদ সিন্ধু তার বাস্তব উদাহরণ; যেখানে স্বয়ং লেখক স্বীকার করেছেন যে বহু ঘটনার প্রমাণ নেই।
কিন্তু সময় এসেছে নতুন, সঠিক, প্রমাণিত ও বিশ্বস্ত সাহিত্য নির্মাণের। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আমাদের লেখকরা যদি একই ধারা ধরে রাখেন এবং অন্য লেখকেরাও এই পথ অনুসরণ করেন, তাহলে নিকট ভবিষ্যতে আমরা আরেকটি কালজয়ী ধর্মভিত্তিক উপন্যাস সাহিত্য-ইতিহাসে দেখতে পাব।
যারা এই বইটির পেছনে পরিশ্রম করেছেন আল্লাহ তাঁদের সবাইকে উত্তম প্রতিদান দিন।
কিছু কথা!
আর আমাকে ক্ষমা করবেন; আমি কোনো সাহিত্যিক, কাব্যিক বা উপন্যাসিক নই। তাই আমার লেখা তাদের মতো সাজানো নাও হতে পারে। শুধু পাঠ-অনুভূতি থেকে যা সত্য মনে হয়েছে তাই লিখেছি। ভুল হলে বলবেন। আমি আজও ছাত্র; শিখছিলাম, শিখছি, শিখতে থাকব।